Friday, March 8, 2019

মহাশক্তি মা কালী-১


ব্রহ্ম ও শক্তি অভেদ। যিনি ব্রহ্ম তিনিই শক্তি, তিনিই মা কালী। কালকে কলন করেছেন বলে তিনি কালী। 'কলন' শব্দের অনেক অর্থ; যেমন- গতি, ক্ষেপ, জ্ঞান, গণন, ভোগীকরন, শব্দ ও স্বাত্মলয়ীকরন। আচার্যগণ বলেন, এই মহাশক্তি বিশ্বকে ক্ষেপণ করেন, জীবকে তত্ত্বজ্ঞান দেন, বিশ্বকে সংহার করেন বলে তিনি কালী। শক্তি সগুণ, নির্গুণ, সাকার বা নিরাকার হতে পারেন।
কুলর্ণা তন্ত্রেে বলা হয়েছে--
অদ্বৈতং কেচিদিচ্ছন্তি দ্বৈতমিচ্ছন্তি চাপরে।
মম তত্ত্বংং বিজানন্তো দ্বৈতাদ্বৈত বিবর্জিতম।।

অনুবাদ- আমার তত্ত্বকে কেউ কেউ অদ্বৈত বলতে চায়, কেউবা দ্বৈত। কিন্তু তত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তিরা জানেন তা দ্বৈতাদ্বৈত বর্জিত।
শক্তিবিহীন ব্যর্থ সমগ্র বিশ্বচরাচর। আমরা যদি একটু চিন্তা করে দেখি তাহলে দেখব, শক্তি ছাড়া আমরা অচল। বাক্শক্তি, দৃষ্টিশক্তি, চলৎশক্তি, শ্রবনশক্তি, ইন্দ্রিয়শক্তি সকল ক্ষেত্রেই আমরা শক্তির প্রকাশ লক্ষ্য করে থাকি। তাই শক্তির অপরিহার্যতার কথা আমরা এক মুহূর্তের জন্যও অস্বীকার করতে পারবো না। দর্শনগত যুক্তিতে বলা যায়, শক্তিছাড়া আরাধনাই নেই, হতেও পারে না।
শক্তি যখন আমাদের ত্যাগ করবেন তখন আমরা নিশ্চল বা মৃত মা। চৈতন্য শক্তি ছাড়া শব, ই-যুক্ত হলে অর্থাৎ শক্তি যুক্ত হলে হয় শিব। কেবল চৈতন্যে সৃষ্টি হয় না, শক্তি সংযুক্ত হলে তবেই সৃষ্টি হয়। তখনই অখন্ড চৈতন্য ঈশ্বর হন। মহাকাল শিব শক্তিহীন হলেই 'শব', শক্তিমান হলেই মঙ্গলকারী শিব।

কর্পূরাদিস্তোত্রে বলা হয়েছে--
প্রসূতে সংসারং জননী ভবতী পালয়তি চ
সমস্তং ক্ষিত্যাদি প্রলয়সময়ে সংহরতি চ।
অতস্ত্বং ধাতাসি ত্রিভুবনপতিঃ শ্রীপতিরপি
মহেশোহপি প্রায়ঃ সকলমাপি কিং স্তৌমি ভবতি।।

অনুবাদ- মা তুমি জগতের প্রসূতি ও পালয়িত্রী, প্রলয়কালে ক্ষিত্যাদি সকল ভূতবর্গকে সংহার করে নিজ মধ্যে টেনে নাও, তাই তুমিই ধাতা, ত্রিভুবনপতি, শ্রীপতি এবং মহেশ্বরও তুমি।

শ্রীশ্রী চন্ডীতে বলা হয়েছে--
ত্বয়ৈতদ্ধার্য়তে বিশ্বং ত্বয়ৈতৎ সৃজ্যতে জগৎ।
ত্বয়ৈতৎপাল্যত দেবি ত্বমৎস্যন্তে চ সর্বদা।।
(চন্ডী, ১/৫৬)   
অনুবাদ- দেবি তুমিই বিশ্ব ধারণ করে রয়েছ, তুমিই জগৎ সৃষ্টি করে পালন করছ, আবার সর্বদা সংহার করছ।
আবার দেবী ভগবতে বলা হয়েছে---
জ্ঞাতং ময়াখিলমিদং ত্বয়ি সন্নিবিষ্ট,
ত্বত্তোহস্য সদ্ভব লয়ারপি মাতরস্য।
শক্তিশ্চ তেজশ্চ কারনে বিতত প্রভাবা
জ্ঞাতধুনা সকললোকময়ী নূনম।
বিস্তার্য সর্বমখিলং সদসদ্বিকারেং
 সন্দর্শরস্যবিকলং পুরুষায় কালে।

অনুবাদ- হে মাতা আমি বুঝেছি, এই সমস্ত জগৎ আপনাতেই সন্নিবিষ্ট। আপনা হতেই এর উৎপত্তি ও লয় হচ্ছে। এই জগৎ সৃষ্ট বিষয়ে আপনার অসীম শক্তির প্রভাব। এখন বুঝলাম আপনার সে শক্তি সর্বলোকময়ী। সৃষ্টিকালে আপনি সৎ অর্থাৎ আকাশ বায়ু রূপ অমূর্ত ভূতদ্বয় এবং অসৎ অর্থাৎ তেজ, জল ও মৃত্তিকারূপ করে ভোক্তা চৈতন্যরূপী পুরুষকে কালে দেখিয়ে থাকেন। 

No comments:

Post a Comment